তানভীর আজাদ কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি: কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, উর্বর ও আলোচিত আসন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। প্রশাসনিক সদর হওয়ায় এখানকার রাজনৈতিক তৎপরতা শুধু জেলা নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও আলাদা গুরুত্ব বহন করে। তাই এ আসনের নির্বাচনী ফলাফল বরাবরই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষ নজরে থাকে। ১৯৯১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সময়ে এই আসনে পর্যায়ক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলেও রাজনৈতিক পালাবদলের পর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের খন্দকার রশিদুজ্জামান দুদু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ। ফলে টানা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রভাব ও আধিপত্য বজায় ছিল। তবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই চিত্র বদলানোর বড় সুযোগ দেখছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা প্রার্থীরা । বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশ এবার কুষ্টিয়া-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার। তিনি ২০১৮ সালেও দলের প্রার্থী ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আলোচনায় আসেন। জাকির হোসেন সরকার বলেন, “আমি অতীতে জামায়াতের প্রার্থীকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলাম। এবারও আশা করছি কুষ্টিয়া-৩ আসনটি ধানের শীষের ঝুলিতে তুলতে পারব ইনশাআল্লাহ ।” মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই জেলা বিএনপিতে ঐক্যের চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিনের অনুসারীরাও জাকির সরকারের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। বশিরুল আলম চাঁদ, কাজল মজুমদার, জাহিদুল ইসলাম বিপ্লবসহ স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। সোহরাব উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলেন, “ভেদাভেদ ভুলে এখন আমাদের লক্ষ্য একটাই—ধানের শীষের জয়। সবাই এক কাতারে থেকে লড়াই করবো।” জামায়াতের ভিন্ন কৌশলএই আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জনপ্রিয় ওয়াযিন ও আলোচিত বক্তা মুফতি আমির হামজা। ওয়াজের মঞ্চে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে এবার রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে জামায়াত। তবে অতীতের কিছু বিতর্কিত বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া মন্তব্য তাঁর প্রার্থিতাকে করেছে আলোচিত ও বিতর্কিত। মাঠ পর্যায়ে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমির হামজা বলেন, “মানুষ পরিবর্তন চায়। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়াই আমাদের লক্ষ্য। মানুষ দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। তবে ভোটের মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।” তিনি বিশেষভাবে তরুণ ও নারী ভোটারদের দিকে নজর দিচ্ছেন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে প্রার্থী হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমদ আলী এবং খেলাফত মজলিস থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা আব্দুল লতিফ। ফলে ভোটের সমীকরণে ছোট দলগুলোর প্রভাবও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাকির হোসেন সরকারের সাংগঠনিক শক্তি, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্য তাঁকে এগিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, আমির হামজা তাঁর ধর্মীয় জনপ্রিয়তা দিয়ে ভোটের হিসাব পাল্টানোর চেষ্টা করছেন। তবে তাঁর বিতর্কিত অতীত বক্তব্য ভোটের মাঠে কী প্রভাব ফেলে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।সব মিলিয়ে, কুষ্টিয়া-৩ আসনটি এবার পরিণত হয়েছে একটি কঠিন ও রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চে। দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে ওঠে কি না, সেটিই এখন কুষ্টিয়াবাসীর পাশাপাশি গোটা দেশের নজর কেড়ে নিয়েছে।