লেখক- মো:আবুতাহের পাটোয়ারী,কলামিস্ট ওমানবাধিকার নেতা,সম্পাদক, নবজাগরণ পত্রিকা
সময়, এই নেতা-বাংলাদেশের পুনর্জন্মের মুহূর্ত: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচন-নতুন বাংলাদেশ রচনার পবিত্র মুহূর্ত
নতুন দৃষ্টিমো: আবু তাহের পাটোয়ারী:
গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল জোয়ারে সংকটময় এক রাষ্ট্র আজ নতুন সূচনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। যে ভয়, দমন-পীড়ন, দখলদারি, দুর্নীতি ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি আমাদের রাষ্ট্রকে অন্ধকারের প্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল-সেই অন্ধকার চিরে আজ এক আলোর সম্ভাবনা জন্ম নিয়েছে। এই সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু-আসন্ন জাতীয় নির্বাচন।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা থেকে সারাদেশের ইউএনওদের সঙ্গে নির্বাচন প্রস্তুতি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস যে বাক্য উচ্চারণ করেছেন, সেটি শুধু প্রশাসনের প্রতি বার্তা নয়-এটি পুরো জাতির প্রতি এক ঐতিহাসিক আহ্বান- “এই নির্বাচন সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের মাধ্যমে আমরা একটি স্মরণীয় নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ তৈরি করতে চাই।”এমন সময়ে নির্বাচন কমিশনও তফসিল ঘোষণা করেছেন, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক ভোটের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে-এবার দায়িত্ব ভোটারের।
রাষ্ট্রের সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি-এটি ভুল সিদ্ধান্তের দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশ আজ যে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক ও ন্যায়বিচারের সংকটে দাঁড়িয়ে-এটি কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়।এটি দশকের পর দশক ধরে ভুল নেতৃত্বকে বেছে নেওয়ার সম্মিলিত ফল।আমরা মুখে ঘৃণা করি চাঁদাবাজকে, দুর্নীতিবাজকে, টেন্ডারবাজকে, কমিশনখোরকে, বন্দর লুটেরাকে।আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিই।আমরা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের প্রসার দেখে হতবিহ্বল হই।
কিন্তু ভোটের দিনের এক সিদ্ধান্তে-আমরাই আবার সেই মানুষগুলোকে ক্ষমতায় বসাই।তারপর পাঁচ বছর তাদের অত্যাচার, লুটপাট, সিন্ডিকেট, দুর্নীতি, প্রশাসনিক অপব্যবহারের কারণে আমরা ক্ষুব্ধ হই।কিন্তু দায় কার?উত্তর একটাই-জনগণ।একটি সমাজ নিজের বিবেককে অমান্য করে অপরাধীকে নেতৃত্বে পাঠালে সেই সমাজ কখনো ন্যায়, উন্নয়ন বা গণতন্ত্র পায় না।নেতা রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করেন না-নির্বাচন ও ভোটার রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন।
স্বাধীন বিচার সচিবালয়: নতুন রাষ্ট্রের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর
প্রধান বিচারপতি ড.কেফায়েত উল্লাহ ও উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সম্প্রতি স্বাধীন বিচার সচিবালয় উদ্বোধন করে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করেছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার-বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে নিজস্ব প্রশাসনিক স্বাধীনতা পেল।এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?কারণ স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া-রাষ্ট্র থাকে ব্যক্তির হাতে আইন থাকে শক্তিশালীর পকেটে সত্য থাকে ক্ষমতার জিম্মায় ন্যায়বিচার থাকে বঞ্চিত মানুষের কান্নায় স্বাধীন বিচার সচিবালয় হলো-গণতন্ত্রের আত্মা ফিরে পাওয়া, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনগণের জয়, নতুন রাষ্ট্রের প্রথম ভিত্তি।যিনি এই সংস্কারের সূচনা করলেন-তিনি এবার নির্বাচনকে বলেছেন “নতুন বাংলাদেশ গড়ার সোনালি সুযোগ”।এখন প্রশ্ন-এই সুযোগকে আমরা কি নষ্ট করব, নাকি কাজে লাগাব?
গণভোটে “হ্যাঁ”ভোট:নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম গণবিপ্লব এই গণভোট শুধু একটি ভোট নয়।এটি এক নৈতিক বিপ্লব, এক বিবেকের যুদ্ধ,এক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঘোষণা।“হ্যাঁ” ভোট মানে-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান জনগণের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া বিচারহীনতার কালো অধ্যায় শেষ করার অঙ্গীকার সৎ-যোগ্য নেতৃত্বের উত্থানের বৈধতা নতুন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের গণসমর্থন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রথম শপথ এই “হ্যাঁ” ভোটকে বিজয়ী করবে কে?কেউ না-শুধু জনগণ।এটি দল বা গোষ্ঠীর লড়াই নয়-এটি জাতির বিবেকের রায়।
অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত-আজকের ভয়াবহ সংকট
ভুল মানুষকে ভোট দেওয়া যে ব্যক্তির সম্পদের উৎস অজানা,যে রাতারাতি বাড়ি-গাড়ি-হোটেল-টেন্ডারের মালিক,সে জনগণের নয়-সে হয় মাফিয়া সিন্ডিকেটের দাস।
প্রথম কাজ: নিজের নির্বাচনী খরচ তোলা।ফল: জনগণ বঞ্চিত, রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত।দখল-চাঁদাবাজ রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়া যে রাজনীতিতে-আশ্রয় মানে দখল,স্নেহ মানে কমিশন,দলীয় পদ মানে ভাগবাটোয়ারা,সেই রাজনীতি ক্ষমতায় এলে দেশের গতি থেমে যায়, রাষ্ট্র চলে যায় কর্পোরেট দখলদারদের হাতে।
সৎ মানুষকে রাজনীতি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া
যেখানে নির্বাচনে দাঁড়াতে লাগে কোটি টাকার কালো বাজেট,যেখানে রাজনীতি চলে টেন্ডার-চাঁদার টাকায়,
সেখানে আদর্শিক ও দেশপ্রেমিকরা টিকবে কীভাবে?
ফলে রাজনীতি হয় দুর্বৃত্তদের হাতিয়ার।এবার প্রশ্ন-দেশকে আবারও কার হাতে দেবেন?একজন ভোটার যখন কেন্দ্রে ঢোকে, তখন সে শুধু একজন ব্যক্তি নয়। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে-তার সন্তানের ভবিষ্যৎ তার পরিবারের নিরাপত্তা তার এলাকার উন্নয়ন তার সমাজের ন্যায়বিচার তার দেশের ভবিষ্যৎ একটি ভুল ভোট মানে-নিজ ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা।একটি সঠিক ভোট মানে-নতুন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া।
চাঁদাবাজ-দুর্নীতিবাজ নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রের কী হয়?
দুর্নীতি রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিণত হয় প্রকল্পের ৪০-৬০% চলে যায় কমিশন-সিন্ডিকেটে প্রশাসন হয়ে যায় এমপিদের তল্পিবাহক ন্যায়বিচার হয় ব্যতিক্রম ব্যবসা-শিল্প খাত হয়ে পড়ে চাঁদাবাজদের করদ রাজস্ব জনগণ হয় নির্বাক-রাষ্ট্র হয় বেপরোয়া-কাকে ভোট দেবেন?-স্পষ্ট তিন মানদণ্ড সততা যার নামে দখল, টেন্ডার, চাঁদাবাজি নেই। যার সম্পদের উৎস স্পষ্ট।যাকে মানুষ “ভালো লোক” বলে চেনে।যোগ্যতা সংসদ সদস্য কোনো স্লোগানবাজের পদ নয়-এটি আইন তৈরির পদ।দেশ চালাবে যে-তার মধ্যে জ্ঞান, দূরদৃষ্টি, পড়াশোনা, দক্ষতা থাকতে হবে।জনমানুষের পাশে থাকা ক্ষমতার মোহ নয়-দায়িত্বের প্রতি সম্মান থাকতে হবে।
নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান:“তোমরাই নতুন রাষ্ট্রের স্থপতি”আজকের তরুণরাই দেখেছে-চাকরিতে ঘুষ ক্যাম্পাসে দখলদারি শিক্ষায় বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট বিচারহীনতা বন্দর-ব্যবসা-নিয়োগে দুর্নীতির দৌরাত্ম্য
রাজনৈতিক দখলদারির নিষ্ঠুর বাস্তবতা গণঅভ্যুত্থানে যে প্রজন্ম রক্ত দিল, আগুন দিল, বুক দিল-তাদের হাতেই এবার কলম ও ব্যালটের শক্তি।এই নির্বাচন নতুন প্রজন্মের জন্য এক নতুন ডাক-“যে রাষ্ট্র তুমি চেয়েছিলে-সেটি এখন তোমার ভোটে গড়ে ওঠবে।”
ভোটারদের অঙ্গীকার: নতুন রাষ্ট্রগঠনের শপথ
টাকা নয়-নীতিকে ভোট দেব পরিচয় নয়-যোগ্যতাকে ভোট দেব ভয় নয়-সাহসকে ভোট দেব অন্ধ আনুগত্য নয়-
সংবিধানকে ভোট দেব দল নয়-জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেব বাংলাদেশকে পরিবর্তন করবে দল নয়-জনগণ। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় এবং জাতীয় নির্বাচনে সৎ-যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নেওয়া-এই দুই সিদ্ধান্তই বলে দেবে-বাংলাদেশ কি আবার অন্ধকারে ডুবে যাবে,
নাকি নতুন আলোর যুগে প্রবেশ করবে।আপনার একটি ভোটই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লেখা হবে ভোটারের হাতে। নতুন বাংলাদেশ-
ভোটারের ভোটেই জন্ম নেবে।


