মোহাম্মদ সেলিম 

জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া 


ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘাটুরা এলাকায় এক সাংবাদিকের ওপর সংঘটিত নৃশংস হামলার ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাচেষ্টা মামলার বাদীর বিরুদ্ধেই অভিযুক্ত পক্ষের পাল্টা মামলা দায়েরের ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক সমাজ, সুশীল সমাজ এবং সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওই সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা সংঘবদ্ধভাবে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করে তার হাত ও পায়ের রগ কেটে গুরুতর জখম করে। ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।


এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক বাদী হয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে হত্যা প্রচেষ্টার অভিযোগে থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় কয়েকজনকে আসামি করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগ আনা হয়।


কিন্তু ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই অভিযুক্ত পক্ষ একই থানায় বাদীর বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলা দায়ের করে। এতে করে ঘটনাটি নতুন মোড় নেয় এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। অনেকেই মনে করছেন, গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থেকে দৃষ্টি সরাতে এবং তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে কৌশলগতভাবে এই পাল্টা মামলা করা হয়েছে।


ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, যারা হামলার সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে উল্টো বাদীকেই আইনি জটিলতার মধ্যে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিচারপ্রার্থীদের নিরুৎসাহিত করে এবং অপরাধীদের জন্য এক ধরনের সুযোগ তৈরি করে দেয়।


সাংবাদিক সমাজের অনেকেই এ ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, একজন সাংবাদিক সমাজের সত্য তুলে ধরার জন্য কাজ করেন এবং অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। সেই সাংবাদিকই যদি হত্যাচেষ্টার শিকার হন এবং পরে উল্টো তার বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়, তবে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি।


আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি আইনে কোনো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষ মামলা করতে পারে, তবে পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে যাচাই করে প্রকৃত ঘটনার সত্যতা উদঘাটন করা। একই সঙ্গে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।


এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। তারা মনে করছেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা আরও বাড়তে পারে।


সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনও বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, একটি হত্যাচেষ্টা মামলার বাদীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা হওয়া মানেই ঘটনাটি গভীরভাবে তদন্তের দাবি রাখে। প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষতা বজায় রেখে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।


তারা আরও বলেন, আইন সবার জন্য সমান। কেউ যদি প্রভাব বা ক্ষমতার জোরে আইনের অপব্যবহার করে নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করার চেষ্টা করে, তবে সেটি আইনের শাসনের পরিপন্থী। এ ধরনের অপচেষ্টা রোধে প্রশাসনের দৃঢ় ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।


এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, উভয় পক্ষের দায়ের করা মামলার বিষয়টি আইন অনুযায়ী তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


তবে ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাংবাদিক সমাজসহ সচেতন মহল মনে করছে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা না হলে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই তারা অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে।