লিখেছেন: কিশোর কণিক ঢাকার আকাশটা আজ বিকেল থেকেই ভার হয়ে আছে। মেঘের গুরুগুরু গর্জনের সাথে পাল্লা দিয়ে নামল বৃষ্টি। নিউ ইস্কাটনের দশতলার অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে সেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিলেন আরশাদ সাহেব। বয়স পঁচাত্তর পেরিয়েছে। স্ত্রী গত হয়েছেন বছর পাঁচেক হলো, ছেলেমেয়েরা যে যার সংসারে বিদেশে ব্যস্ত। এই বিশাল ফ্ল্যাটে এখন কেবল তিনি আর তার একরাশ নীরবতা।শহরের এই যান্ত্রিক কোলাহলে বৃষ্টি তার কাছে এক অদ্ভুত ভালোলাগা নিয়ে আসে। মনে হয়, আকাশটাও বুঝি তার মতো মাঝে মাঝে খুব একা বোধ করে, তাই কেঁদে হালকা হয়।কলিং বেলের শব্দে ঘোর ভাঙল। এই অসময়ে কে এলো?ধীর পায়ে দরজা খুলতেই দেখলেন, সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি বছর বিশেকের ছেলে। পরনে ফুড ডেলিভারি কোম্পানির নীল রঙের রেইনকোট, কিন্তু তাতেও সে ভিজে একসা। মাথার চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। হাতে খাবারের প্যাকেট।“স্লামালাইকুম আঙ্কেল, আপনার খাবার।” ছেলেটি হাঁপাচ্ছে। লিফট নষ্ট, দশ তলা সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়েছে বেচারার।আরশাদ সাহেব প্যাকেটটা হাতে নিলেন। ছেলেটার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, হয়তো ঠান্ডায় বা ক্লান্তিতে। তিনি মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করতে গিয়েও থামলেন। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা, তোমার খুব কষ্ট হয়েছে, তাই না? সিঁড়ি ভেঙে ওঠা...”ছেলেটি ম্লান হাসল, “না আঙ্কেল, অভ্যাস আছে। এটাই তো কাজ।”ছেলেটি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। আরশাদ সাহেব হঠাৎ বলে উঠলেন, “শোনো, একটু দাঁড়াবে? বাইরে তো তুমুল বৃষ্টি। এক কাপ চা খেয়ে যাও।”ছেলেটি অবাক হলো। এই শহরে ডেলিভারি ম্যানদের কেউ সহজে ঘরের ভেতরে ডাকে না। সে ইতস্তত করে বলল, “না আঙ্কেল, দেরি হয়ে যাবে। আরও ডেলিভারি আছে।”“আরে হোক দেরি। এই বৃষ্টিতে তো বাইক চালাতেও পারবে না। এসো, আমারও একা একা চা খেতে ভালো লাগে না।”আরশাদ সাহেবের কণ্ঠে এমন এক আকুতি ছিল যে ছেলেটি আর না করতে পারল না। জুতো জোড়া বাইরে রেখে সংকোচের সাথে ভেতরে ঢুকল সে। নাম তার রাজু। গ্রামে মা আর ছোট বোন আছে, তাদের খরচ চালাতেই এই শহরে তার জীবনযুদ্ধ।বারান্দায় বসে দুই প্রজন্মের দুজন মানুষ। বাইরে বৃষ্টির অবিরাম শব্দ, ভেতরে চায়ের কাপের টুংটাং। ধোঁয়া ওঠা আদা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রাজুর শরীরে যেন প্রাণ ফিরে এলো।আরশাদ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে, তাই না?”রাজু জানালার বাইরে তাকাল। ঝাপসা চোখে বলল, “পড়ে আঙ্কেল। মায়ের হাতের চা খুব মিস করি। এই শহরে সবাই খুব ব্যস্ত, কারো দিকে তাকানোর সময় নেই কারো।”আরশাদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “ঠিক বলেছ বাবা। আমরা সবাই খুব কাছাকাছি থাকি, তবুও আমরা সবাই খুব একা।”চা শেষ হলো। বৃষ্টিও কিছুটা ধরে এসেছে। রাজু উঠে দাঁড়াল। “আঙ্কেল, আজ যাই। আপনার চা-টা খুব দারুণ ছিল। মনে হলো অনেকদিন পর বাড়িতে বসে চা খেলাম।”যাওয়ার সময় রাজু ঝুঁকে আরশাদ সাহেবের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। আরশাদ সাহেব ছেলেটির মাথায় হাত রাখলেন। তার মনে হলো, অনেকদিন পর তার হাতটা কারো স্পর্শ পেল, যা খুব আপন।দরজা বন্ধ করে আরশাদ সাহেব আবার বারান্দায় এসে বসলেন। বৃষ্টি থেমে গেছে। শহরের রাস্তায় আবার গাড়ির হর্ন, মানুষের ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। কিন্তু দশতলার এই বারান্দাটা এখন আর আগের মতো শূন্য মনে হচ্ছে না। এক কাপ চা, আর কিছুক্ষণের কথোপকথন—এটুকু উষ্ণতাই তো মানুষ খোঁজে।শহরের ভিড়ে আজও কিছু জানালা খোলা থাকে, যেখানে অচেনা কেউ আপন হয়ে যায়, এক কাপ চায়ের বাহানায়।
বারান্দার এক কাপ চা



