অদ্ভুত চশমা পড়েছে কাশিয়ানী পরিবেশ অধিদপ্তর! চোখে দেখছে না পরিবেশের ধ্বংস

শেখ শোভন আহমেদ,
প্রকৃতি আমাকে হাসায়, প্রকৃতি আমাকে কাঁদায়! প্রকৃতি আমাকে ভাঙ্গে গড়ে, প্রকৃতি আমাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। কিন্তুক সেই প্রকৃতির সবুজে বিস্তৃত ভূমি যখন হুমকির মুখে, পরিবেশ যখন নিয়মিত বিষাক্ত সিসা গিলছে আর ধংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।তখন ও আমরা নীরব। তবে আমরা চুপ করে আছি নাকি চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে কোন বিশেষ কৌশলে।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পারুলিয়া এলাকার সোনাডাঙ্গা খালের পশ্চিম পাশে গড়ে উঠেছে ‘এমএস মেটাল’ নামের এক সিসা তৈরির কারখানা, যা এখন পুরো এলাকাকে বিষাক্ত করে তুলেছে। পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানোর মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে সিসা—আর সেই প্রক্রিয়ায় নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া, অ্যাসিডের দুর্গন্ধ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। এতে ফসলি জমি, খাল-বিল, মাছ, গাছপালা এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দিনে ব্যাটারি ভাঙা আর রাতে পোড়ানোর কাজ চলে অবিরামভাবে। চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে পুরো গ্রাম। টিনের ঘরগুলোতে পড়েছে কালো দাগ, ফসলি জমিতে বিষাক্ত বর্জ্য গিয়ে পড়ায় তিন ফসলি জমি এখন অনুর্বর হয়ে পড়েছে। খাল-বিলের পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে মানুষ ও গবাদিপশু গোসল করার পর অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, শরিফুল ইসলাম দুর্জয় নামে এক ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে স্ত্রীর নামে অনুমোদন নিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। ব্যাটারি রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরির অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে সেখানে ব্যাটারি পোড়িয়ে সিসা তৈরির কাজ চলছে। অথচ “আধুনিক পরিশোধন ব্যবস্থা” থাকার কথা বলা হলেও, এয়ার ট্রিটমেন্ট (ATP) বা ওয়াটার ট্রিটমেন্ট (ETP) প্লান্টের কোনো অস্তিত্ব নেই।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কারখানার বিরুদ্ধে মুখ খুললেই হামলা, মামলা ও হুমকির শিকার হতে হয়। অনেককেই জেল খাটতে হয়েছে বা এলাকা ছেড়ে যেতে হয়েছে। এমনকি সরকারি খাল দখল ও ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটেরও অভিযোগ উঠেছে দুর্জয়ের বিরুদ্ধে। এতে বিএডিসির কৃষিজমি পরিত্যক্ত হয়ে গেছে।
স্থানীয় হাবিব আওলাদ বলেন,এই বিষাক্ত সিসা কারখানাটি ঘনবসতিপূর্ণ গ্ৰামে হওয়ায় এলাকার কৃষিসহ সকল কিছুতে প্রবাব পড়ছে যার ফলাফল অত্যন্ত খারাপ।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জুয়েল মোল্লা বলেন, “একসময় দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা দুর্জয় এখন ভয়ঙ্কর প্রভাবশালী। অস্ত্র নিয়ে ঘোরে, কেউ কিছু বললে হুমকি দেয়।”
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেন, সিসা দূষণ কেবল কৃষি ও পরিবেশ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। শিশুরা শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ, মাথাব্যথায় ভুগছে। সিসা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করছে।
সম্প্রতি আইসিডিডিআরবি’র এক গবেষণায় উঠে এসেছে, সিসা দূষণে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু রক্তে অতিরিক্ত সিসা নিয়ে বেঁচে আছে—যার বড় উৎস এসব ব্যাটারি ও সিসা কারখানা।
গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেন, “স্থানীয়রা ভয় না পেয়ে অভিযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়— এই শরিফুল ইসলাম দুর্জয়ের খুঁটির জোর কোথায়? নাকি পরিবেশ অধিদপ্তর না দেখার অদ্ভুত চশমা পরিধান করেছে?
পরিবেশের নাম করে অনুমোদন পাওয়া এই দানবাকৃতির কারখানার বিরুদ্ধে বাস্তবে কবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
ততদিন পর্যন্ত কাশিয়ানীর সেই সবুজ জনপদই সিসার বিষে ধুঁকতে থাকবে?
এই সকল প্রশ্নের নেই কোন উত্তর জনগণের কাছে আছে শুধু দুর্ভোগ থেকে মুক্তির ইচ্ছা ও আহাজারি।



