নিজস্ব প্রতিবেদক | সাহিত্য ও সংস্কৃতি দিল্লির অলিগলিতে তখন ব্রিটিশ শাসনের পদধ্বনি, আর সেই সময়েই এক কবি নিজের আভিজাত্যকে ধরে রেখেছিলেন পাহাড়সম দৃঢ়তায়। তিনি মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব। টানা ৫৬ বছর ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেও যিনি কখনো মাথা নত করেননি পরিস্থিতির কাছে। সম্প্রতি তাঁর জীবনের এক ঐতিহাসিক ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে, যা বর্তমান প্রজন্মের জন্য আত্মমর্যাদাবোধের এক অনন্য দলিল। স্বর্গের দরজাতেও যাঁর আপসহীন শর্ত মির্জা গালিব বলতেন, "আমার আত্মসম্মানবোধ এতো প্রখর যে, স্বর্গের দরজা যদি আমার জন্য নিজে থেকে না খুলে যায়, তবে আমি সেখান থেকে নির্দ্বিধায় ফিরে আসব।" এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরতা। তিনি মনে করতেন, যোগ্য মানুষের জন্য স্থান নির্ধারিত থাকলে সম্মানজনক অভ্যর্থনাও অবধারিত। ১৮৪২-এর সেই ঐতিহাসিক ইন্টারভিউ ঘটনাটি ১৮৪২ সালের। তৎকালীন ‘দিল্লি কলেজ’-এ ফারসি শিক্ষকের একটি শূন্যপদে গালিবকে চাকরির প্রস্তাব দেয় ব্রিটিশ সরকার। পালকিতে চড়ে কলেজের গেটে পৌঁছে গালিব লক্ষ্য করলেন, প্রথা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে আসেননি। তৎকালীন নিয়ম ছিল, কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি এলে কলেজের সেক্রেটারি বা প্রিন্সিপাল গেটে এসে তাঁকে স্বাগত জানাবেন। যখন কলেজের সেক্রেটারি মিস্টার টমাস বাইরে এসে গালিবকে ভেতরে আসার অনুরোধ করেন, গালিব সাফ জানিয়ে দেন—প্রথা অনুযায়ী অভ্যর্থনা না পেলে তিনি ভেতরে যাবেন না। চাকরি নয়, সম্মানই ছিল শেষ কথা মিস্টার টমাস যখন যুক্তি দেখান যে, গালিব সেখানে একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে এসেছেন, তাই রাজকীয় অভ্যর্থনা তাঁর প্রাপ্য নয়; তখন গালিবের উত্তরটি ছিল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। তিনি বলেছিলেন:
"আমি চাকরি করতে চেয়েছিলাম আমার মর্যাদা বাড়ানোর জন্য, নিজের বর্তমান মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে চাকরি করতে নয়।"
চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সেদিন পালকি ঘুরিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন এই মহাকবি। দারিদ্র্যের আঁধারে ব্যক্তিত্বের আলো মির্জা গালিবের জীবন ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সংমিশ্রণ। একদিকে বংশীয় আভিজাত্য আর কবিতার অঢেল সম্পদ, অন্যদিকে দারিদ্র্য আর ঋণের পাহাড়। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন দিল্লির একটি ভাড়া বাড়িতেই, কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ববোধকে কখনো ঋণী হতে দেননি কারো কাছে। প্রকৃত অর্থে, মির্জা গালিব শিখিয়ে গেছেন যে—সম্পদ কেড়ে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু মানুষের মেরুদণ্ড আর মেধা অজেয়। অভাবের অন্ধকারে ডুবেও নিজের ব্যক্তিত্বের আলোতে উদ্ভাসিত থাকা সেই কিংবদন্তি কবির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।