জাপানের অকৃত্রিম বন্ধু: বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের ১৪০তম জন্মবার্ষিকী আজ

তানভীর আজাদ কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি:
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা আজ ২৭শে জানুয়ারি। বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি আইনবিদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং জাপানের পরম বন্ধু ডঃ রাধাবিনোদ পালের ১৪০তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৮৬ সালের এই দিনে তৎকালীন নদীয়া জেলার (বর্তমান কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ) দৌলতপুরের তারাগুনিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি।
রাধাবিনোদ পালের শৈশব ছিল চরম অভাব-অনটনের। বাবার সন্ন্যাস গ্রহণের পর আত্মীয়দের আশ্রয়ে বড় হওয়া এই প্রতিভাধর মানুষটি কেবল মেধার জোরেই সব বাধা অতিক্রম করেছিলেন। রাজশাহী কলেজ থেকে শিক্ষা শুরু করে পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাধাবিনোদ পালের নাম বিশ্ব ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ‘টোকিও ট্রায়াল’-এর কারণে। ১৯৪৬ সালে জাপানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালের ১১ জন বিচারকের একজন ছিলেন তিনি।
যেখানে বাকি ১০ দেশের বিচারক জাপানকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে ছিলেন, সেখানে রাধাবিনোদ পাল তাঁর ৮০০ পৃষ্ঠার এক কালজয়ী ভিন্নমতের রায় (Dissenting Opinion) প্রদান করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, বিজয়ী পক্ষ কখনো পরাজিত পক্ষের বিচারক হতে পারে না এবং ঔপনিবেশিক শক্তির নৈতিক অধিকার নেই অন্যের বিচার করার। তাঁর এই সাহসী অবস্থান জাপানকে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ ও চরম অবমাননা থেকে রক্ষা করেছিল।
সম্রাট হিরোহিতোর সেই অমর বাণী: > "যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।"
জাপানিরা ডঃ পালকে তাদের অন্যতম জাতীয় বীর হিসেবে সম্মান করে। টোকিও’র বিতর্কিত ও পবিত্র ইয়াসুকুনি শ্রাইনে একমাত্র অ-জাপানি হিসেবে তাঁর সম্মানে একটি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। এছাড়া জাপানের রাস্তা, জাদুঘর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে রিসার্চ সেন্টার রয়েছে। ২০০৭ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ভারত সফরে এসে বিশেষভাবে ডঃ পালের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
আইনশাস্ত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মবিভূষণ’-এ ভূষিত করে। এছাড়া জাপান সরকারের পক্ষ থেকে তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মানীয় পদক ‘কোক্কা কুনশোও’ এবং নিহোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি।
১৯৬৭ সালের ১০ই জানুয়ারি কলকাতায় এই মহীয়সী ব্যক্তিত্ব শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তাঁর জন্মদিনে কুষ্টিয়া থেকে টোকিও—সর্বত্রই এই মহান বাঙালিকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হচ্ছে।



