তিন দফা জানাজা শেষে দাফন: অধ্যাপক আবুল হাশেমের শেষ বিদায়॥

তানভীর আজাদ কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি:
দ্বীনি আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক মাওলানা আবুল হাশেমকে শেষ বিদায় জানাল কুষ্টিয়ার মানুষ। হাজারো মানুষের চোখের জলে, দোয়া ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন এই নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক।
তিন দফা নামাজে জানাজা শেষে মঙ্গলবার দুপুরে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ওয়াপদা মাদ্রাসা-মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সোমবার রাতে মরহুমের নিজ গ্রাম ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপনগরে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন সকাল ৯টায় কুষ্টিয়া শহরের চাঁদাগাড়া ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। নির্ধারিত সময়ের আগেই ঈদগাহ মাঠ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানান।
এই জানাজায় ইমামতি করেন জামায়াতের যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের টিম সদস্য ও সাবেক জেলা আমীর অধ্যক্ষ খন্দকার একে আলী মহসীন। জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নেতৃবৃন্দ মরহুমের জীবনাদর্শ, ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।
বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিএনপি, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুমের ভাই ড. আবু সালেহ ও পুত্র মুজাহিদুল ইসলাম আসিফ আবেগঘন কণ্ঠে উপস্থিত সকলের কাছে দোয়া কামনা করেন।
এরপর মিরপুর ফুটবল মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জানাজা। সেখানে ইমামতি করেন মরহুমের একমাত্র পুত্র মুজাহিদুল ইসলাম আসিফ। জানাজা শেষে তাকে ওয়াপদা মাদ্রাসা-মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে দাফন করা হয়।
গত সোমবার বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের সিঙ্গার মোড়ে এক প্রতিবাদ মিছিল শেষে বক্তব্য দেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন অধ্যাপক আবুল হাশেম। দ্রুত তাকে মান্নান হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।
তিনি রেখে গেছেন এক পুত্র, এক কন্যা ও অসংখ্য গুণগ্রাহী ও সহকর্মী।
অধ্যাপক আবুল হাশেম কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার গোলাপনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। পোড়াদহ কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সাথী, সদস্য থেকে শুরু করে উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি, আমীর এবং পরবর্তীতে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সংগঠনকে সুসংগঠিত রাখতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
বিগত সরকারের সময়ে কারাবরণ করলেও তিনি আন্দোলনের পথ থেকে সরে দাঁড়াননি। বরং সাংগঠনিক দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে কুষ্টিয়া অঞ্চলে জামায়াতের কার্যক্রমকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করান।
তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, ছিলেন সমাজসেবার নীরব কর্মী। মিরপুর দারুস সালাম প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা, এতিমখানা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘদিন দারুস সালাম এতিমখানা মসজিদের খতিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তার স্ত্রী জামায়াতে ইসলামী মিরপুর উপজেলা মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কন্যা সন্তান বিবাহিত ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, আর পুত্র সংগঠনের সাথেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
অধ্যাপক আবুল হাশেমের মৃত্যুতে জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে অধ্যাপক আবুল হাশেমের শূন্যতা দীর্ঘদিন অনুভূত হবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।



