ক্রাইম রিপোর্টার মোঃ আবদুল করিম ।  টোবাকো কোম্পানির আগ্রাসনে গ্রাস হচ্ছে নদীর চর, খাল, ঝিরি ও ফসলি জমি, এতে হুমকির মুখে পড়েছে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা। বান্দরবানের লামা উপজেলায় বহুজাতিক ও দেশীয় তামাক কোম্পানিগুলোর নির্বিচার তামাক চাষ সম্প্রসারণ এখন এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুনাফানির্ভর লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের নামে এসব কোম্পানি নদীর চর, প্রাকৃতিক খাল, ঝিরি এবং উর্বর ফসলি জমিকে তামাক ক্ষেত্রের আওতায় নিয়ে আসছে। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর তামাক মৌসুম শুরুর আগেই বিভিন্ন টোবাকো কোম্পানি কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। অগ্রিম ঋণ, সার ও বীজ দেওয়ার প্রলোভনে কৃষকরা খাদ্যশস্য পরিত্যাগ করে তামাক চাষে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হন। এর ফলে ধান, ভুট্টা, ডাল ও শাকসবজির আবাদ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর ও মরণঘাতী ফসল। তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং আশপাশের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে। লামা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খাল ও ঝিরি ভরাট করে তামাক চাষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের, যা সরাসরি বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পানি আইন, ২০১৩-এর পরিপন্থী। অন্যদিকে, তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩)-এর মূল উদ্দেশ্য হলো তামাকের উৎপাদন ও ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইন থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে কোম্পানিগুলো নির্বিঘ্নে তামাক চাষ সম্প্রসারণে সক্ষম হচ্ছে। এছাড়া জাতীয় কৃষি নীতি ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন, ২০১৩ অনুযায়ী খাদ্যশস্য উৎপাদনযোগ্য জমি সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তামাকের মতো খাদ্যবহির্ভূত ও ক্ষতিকর ফসলের জন্য উর্বর কৃষিজমি ব্যবহার এই নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। সচেতন মহলের অভিমত, অবিলম্বে লামা উপজেলাসহ পার্বত্য অঞ্চলে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। নদী, খাল, ঝিরি ও চরাঞ্চল দখলমুক্ত করে খাদ্যশস্য চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যমান আইনসমূহের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না হলে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা, তিনটিই চরম সংকটে পড়বে।