ভারতীয়দের জন্য পর্যটক ভিসা সম্পূর্ণ বন্ধ: ১৯৭১-এর আগ থেকেই শিক্ষা নেওয়া এক রাষ্ট্রের সাহসী সিদ্ধান্ত

ডেস্ক রিপোর্ট
ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশের পর্যটক ভিসা সম্পূর্ণ বন্ধ-এটি কোনো খুচরা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি রাষ্ট্রীয় আত্মসম্মান, নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে নেওয়া এক কঠোর কিন্তু প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। প্রধান উপদেষ্টা নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারাবাহিক সফলতার তালিকায় এটি যুক্ত হলো আরেকটি স্পষ্ট বিজয় হিসেবে-যেখানে আবেগ নয়, বাস্তবতা ও ইতিহাস কথা বলেছে।এই সিদ্ধান্তের পেছনে আছে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, তিক্ত স্মৃতি, ভাঙা বিশ্বাস এবং সর্বোপরি ১৯৭১-এর আগ থেকেই ভারতীয় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আচরণ থেকে নেওয়া কঠিন শিক্ষা।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে আছে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, তিক্ত স্মৃতি, ভাঙা বিশ্বাস এবং সর্বোপরি ১৯৭১-এর আগ থেকেই ভারতীয় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আচরণ থেকে নেওয়া কঠিন শিক্ষা।
ইতিহাসের পাঠ: ১৯৭১-এর আগেই শুরু হওয়া বাস্তবতা
বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল ১৯৭১ দিয়ে শুরু হয়নি। তারও আগে, ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা ছিল স্বার্থনির্ভর ও আধিপত্যকামী। ১৯৪৭-এর পর পূর্ব বাংলার ভূগোল, জনসংখ্যা ও সম্পদের দিকে দিল্লির দৃষ্টি ছিল কৌশলগত
-বন্ধুত্বের বুলি থাকলেও নীতিতে ছিল নিয়ন্ত্রণের বাসনা।পানির অধিকার, সীমান্ত আচরণ, বাণিজ্য ভারসাম্য-প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ বারবার দেখেছে অসম চুক্তি, একতরফা সুবিধা আর নীরব চাপ। ১৯৭১-এর আগে থেকেই এই প্যাটার্ন তৈরি হয়; পরে কেবল তার রূপ বদলেছে।
স্বাধীনতার পরও ‘বন্ধুত্বের’ মুখোশ
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ভেবেছিল-ভারত বন্ধু হবে। বাস্তবতা বলেছে ভিন্ন কথা। সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টনে টালবাহানা, বাণিজ্যে বৈষম্য, ট্রানজিট-কেন্দ্রিক চাপ-সব মিলিয়ে ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটি বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।পর্যটক ভিসার অপব্যবহার, সীমান্ত এলাকায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর অভিযোগ-এসব আর গুজব নয়; রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নথিতে বারবার উঠে আসা বিষয়।ভিসা বন্ধ-কেন এখন?
কারণ রাষ্ট্র আর অপেক্ষা করতে পারে না।কারণ নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা কোনো পরীক্ষাগার নয়।কারণ ভিসা-সুবিধা দিয়ে কৃতজ্ঞতা কেনা যায় না; কেবল দুর্বলতা প্রকাশ পায়।ভারতীয় পর্যটক ভিসা বন্ধ মানে-সীমান্ত-সংলগ্ন অঞ্চলে অবাঞ্ছিত চলাচল কমানো গোয়েন্দা ঝুঁকি হ্রাস অভ্যন্তরীণ সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিরোধ সমান মর্যাদাভিত্তিক কূটনীতির বার্তা এটি প্রতিশোধ নয়; প্রতিরোধ।এটি বৈরিতা নয়; স্বার্থরক্ষা।অন্তর্বর্তী সরকার ও ইউনূসের নেতৃত্ব: সিদ্ধান্তের সাহস অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেখিয়েছে-রাষ্ট্র চালাতে হলে অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতেও সাহস লাগে। অর্থনীতি,প্রশাসন, আন্তর্জাতিক আস্থা-সব ক্ষেত্রে যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে,ভিসা বন্ধের সিদ্ধান্ত তারই অংশ।
এটি একটি পরিষ্কার বার্তা:বাংলাদেশ আর “চাপ মেনে নেওয়া রাষ্ট্র” নয়।বাংলাদেশ এখন শর্ত নির্ধারণকারী রাষ্ট্র।
‘মানুষ-মানুষে সম্পর্ক’ বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা অনেকে বলবেন-মানুষে-মানুষে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।প্রশ্ন হলো-রাষ্ট্র কি কেবল আবেগে চলে?যেখানে ভিসা সুবিধা বারবার অপব্যবহৃত,সেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।মানুষে-মানুষে সম্পর্ক বন্ধ হয়নি; পর্যটক ভিসা বন্ধ হয়েছে। রাষ্ট্রের দরজা খোলা থাকবে-কিন্তু নিয়মে, মর্যাদায়, সমতায়।
১৯৭১-এর আগের শিক্ষা: শক্ত না হলে টিকে থাকা যায় না,বাংলাদেশ বারবার শিখেছে-দুর্বলতা মানেই সুযোগ।যে রাষ্ট্র নিজের সীমান্ত, ভিসা, বাণিজ্য আর নিরাপত্তা নিজে নিয়ন্ত্রণ করে না-সে রাষ্ট্রের ওপর অন্যরা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়।এই শিক্ষা আমরা ১৯৭১-এর আগেই পেয়েছি। এখন তা প্রয়োগের সময়।আঞ্চলিক বার্তা: সমতা না হলে সুবিধা নেই এই সিদ্ধান্ত কেবল ভারতের উদ্দেশ্যে নয়; এটি পুরো অঞ্চলের জন্য বার্তা-সমতা না থাকলে বিশেষ সুবিধা থাকবে না।বাংলাদেশ চায় বন্ধুত্ব-কিন্তু সমমর্যাদার বন্ধুত্ব।বাংলাদেশ চায় সহযোগিতা-কিন্তু শর্তহীন চাপ নয়।
এটি একটি বিজয়,কারণ এটি আত্মসম্মানের
ভারতীয়দের জন্য পর্যটক ভিসা বন্ধ-এটি কোনো ক্ষণিকের উত্তেজনা নয়। এটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপ। এটি ১৯৭১-এর আগ থেকেই শেখা শিক্ষার প্রয়োগ।অন্তর্বর্তী সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে-বাংলাদেশ এখন নিজের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়,নিজের নিরাপত্তা নিজেই নির্ধারণ করে,এবং প্রয়োজন হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হয় না।এটি একটি বিজয়-কারণ রাষ্ট্র নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নবজাগরণ রাষ্ট্র, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ
লেখক মো:আবু তাহের পাটোয়ারী সম্পাদক, নবজাগরণ



