রেমিট্যান্সের চাকচিক্যে ঢাকা পড়ে যায় যে দীর্ঘশ্বাস: একজন প্রবাসীর দিনলিপি

সিনিয়র রিপোর্টার ফজলে করিম মোঃ নাজমুজ্জমান
ঘড়িতে তখন রাত আড়াইটা। সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি মেসে শুয়ে আছেন করিম মিয়া (ছদ্মনাম)। বাংলাদেশে এখন সকাল সাড়ে পাঁচটা। একটু পরেই তার মা ফজরের নামাজে উঠবেন। করিম মিয়ার চোখে ঘুম নেই। কাল দেশে টাকা পাঠানোর তারিখ। গত মাসে ওভারটাইম কম হয়েছে, তাই চিন্তার ভাঁজ তার কপালে। ছোট বোনের বিয়ের জন্য কিছু বাড়তি টাকা দরকার, বাবাও ওষুধ কেনার কথা বলেছেন।
করিম মিয়ার মতো লাখো প্রবাসীর গল্পটা অনেকটা এমনই। দূর থেকে প্রবাস জীবনকে যতটা রঙিন মনে হয়, কাছের বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি ধূসর। আমরা যারা দেশে থাকি, তারা মাস শেষে ব্যাংকের মেসেজ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নোটিফিকেশনের অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের প্রতিটি টাকার পেছনে কতটা ঘাম, কতটা অপমান আর কতটা নির্ঘুম রাত মিশে আছে, তার খবর আমরা কজন রাখি?
'মেশিন' হয়ে ওঠার গল্প:
প্রবাসীরা অনেকেই তাদের পরিবারের কাছে ধীরে ধীরে রক্তমাংসের মানুষ থেকে 'টাকা বানানোর মেশিন'-এ পরিণত হন। তাদের ফোন করা হয় মূলত প্রয়োজনের কথা জানাতে। "বাবা, এবার ঈদে একটু বেশি টাকা পাঠিও," কিংবা "বাড়ির ছাদটা ঢালাই করা দরকার"—এসব দাবির ভিড়ে চাপা পড়ে যায় প্রবাসী মানুষটার শারীরিক সুস্থতার খোঁজ। তারা নিজেরা হয়তো দিনের পর দিন এক বেলা খেয়ে, ছেঁড়া জুতো সেলাই করে পরেন, যাতে দেশে থাকা পরিবারটি একটু ভালো থাকে।
উৎসবহীন এক জীবন:
প্রবাসীদের জীবনে ঈদ আসে, পূজা আসে, কিন্তু উৎসব আসে না। যখন দেশের বাড়িতে সবাই নতুন জামা পরে আনন্দে মেতে ওঠে, তখন হয়তো কোনো এক প্রবাসী মরুভূমির গরমে কিংবা ইউরোপের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় ডিউটি করছেন। ভিডিও কলে পরিবারের হাসি দেখে তারা সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করেন, কিন্তু কল কেটে যাওয়ার পর একাকীত্বের যে তীব্র দহন তাদের গ্রাস করে, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। প্রিয়জনের মৃত্যুতে শেষবার মুখটি দেখতে না পাওয়ার যন্ত্রণা অনেক প্রবাসীকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা:
জীবনের সোনালী সময়টা প্রবাসে কাটিয়ে যখন তারা দেশে ফেরেন, তখন অনেকেই দেখেন তাদের সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। সবটাই পরিবারের পেছনে খরচ হয়ে গেছে। অনেক সময় আপনজনরাই তাদের বোঝা মনে করতে শুরু করে। যে সম্মানের আশায় তারা দেশ ছেড়েছিলেন, সেই সম্মানটুকুও অনেক সময় জোটে না।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা তাই কেবল পরিসংখ্যানের সংখ্যা নয়। তাদের পাঠানো অর্থের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো শোনার মতো কান ও হৃদয় আমাদের থাকা প্রয়োজন। তাদের ত্যাগকে শুধু অর্থের মানদণ্ডে বিচার না করে, তাদের প্রাপ্য মানবিক মর্যাদাটুকু দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।



