সড়কে আর কত শান্তার স্বপ্ন পিষ্ট হবে?

নাঈম ইসলাম
আবারও রক্তে রঞ্জিত হলো রাজপথ। আবারও একটি পরিবারের স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেল বেপরোয়া বাসের চাকায়।
চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের চাঁদপুর সদর উপজেলার ঘোষেরহাট এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন রাহেলা আক্তার শান্তা। জিলানী চিশতী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির এই মেধাবী ছাত্রীর মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, দেশের সড়কগুলো এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। শান্তা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, সে ছিল বড় শাহতলী এলাকার শামছুল হুদার স্বপ্ন। কিন্তু ঘাতক বাসের চাকায় সেই স্বপ্ন আজ পিষ্ট।
রাহেলা যখন রাস্তা পার হচ্ছিলেন, তখন দ্রুতগামী একটি 'আইদি' পরিবহনের বাস তাকে চাপা দেয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফায়েজ আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে আইনি প্রক্রিয়া চালুর কথা জানিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আইনি প্রক্রিয়া কি শান্তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে? নাকি এটিও অন্যান্য সড়ক দুর্ঘটনার মতো কেবল একটি ফাইলে বন্দি হয়ে থাকবে?
আমাদের দেশের আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের যে বেপরোয়া গতি এবং চালকদের খামখেয়ালি, তাকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। লাইসেন্সহীন চালকদের কারণে সড়কের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। পরিবহন খাতের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে অনেক সময় সঠিক বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সড়ক নিরাপত্তা আইন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো গ্যারান্টি নেই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সড়ক নিরাপত্তা বা জনগুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো সংস্কারের জন্য একটি স্থায়ী ও স্বচ্ছ কাঠামো প্রয়োজন। সংবিধান বা রাষ্ট্রীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন হুটহাট করে পরিবর্তনের সুযোগ থাকা উচিত নয়। বরং যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেবল একটি নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা উচিত। এই কমিটিগুলো যেন সরাসরি জনগণের মত নিয়ে গঠিত হয় এবং কেবল জনগণের কাছেই দায়বদ্ধ থাকে।
ভবিষ্যতে সংবিধানের সুরক্ষাকবচ এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের সুবিধার্থে আইন পরিবর্তন করা না যায়। কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমেই যেন যেকোনো আইনি সংস্কার প্রস্তাব আসে।
সড়ক নিরাপদ করতে হলে কেবল শোক প্রকাশ বা তদন্ত কমিটি গঠন যথেষ্ট নয়।
চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক সড়কসহ বিভিন্ন মহাসড়কের মতো ব্যস্ত সড়কে গতিরোধক, জেব্রা ক্রসিং এবং নিয়মিত ট্রাফিক মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। 'আইদি' পরিবহনের মতো যে বাসগুলো বেপরোয়া গতিতে চলে, তাদের রুট পারমিট বাতিলসহ চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আর কত শান্তার মৃত্যুতে নড়েচড়ে বসব? রাজপথ যেন আর কারো পরিবারের শোকের কারণ না হয়। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে আমাদের জোর দাবি—অবিলম্বে সড়ক খাতের সংস্কারে একটি শক্তিশালী, নির্বাচিত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হোক এবং আইনের কঠোর শাসন নিশ্চিত করা হোক।
মনে রাখতে হবে, আজ যে শিক্ষার্থীটি নিরাপদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছে, তার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।



