১৫ কারণে ভাঙতে পারে সমঝোতা

ডেস্ক রিপোর্ট
০১। প্রথমে নিরেট ইসলামী পাঁচটি দল “ওয়ান বক্স পলিসি”তে সমঝোতার ঘোষণা করে। মিডিয়ায় নিউজ হয় জামায়াতকে বাইরে রেখে জোট-সমঝোতায় বসছে ইসলামী পাঁচ দল। পরবর্তীতে জামায়াত যোগদান করে। প্রথমে জামায়াত আমীর সবকিছু সমঝোতার ভিত্তেতে হবে, দরকার হলে আমার আসনও ছেড়ে দেবো, এখানে কেউ কাউকে আসন দেবার ক্ষমতা রাখে না’র উদার বাণী শুনালেও আস্তে আস্তে প্রচার শুরু করে তারা জোটপ্রধান! কোন দল কত আসন পাবে সেটাও নির্ধারণ করে তারা! মিডিয়ায় প্রচার করায় “জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট!” উড়ে এসে জুড়ে বসবার মতো। অথচ পাঁচ দল জামায়াতকেই প্রায়োরিটি দিয়েছিল। তাদের আলাদা মোড়ল সাজবার দরকার ছিল না।
০২। বিভাগওয়ারি সমাবেশগুলো সুন্দরভাবেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু আসন সমঝোতায় গিয়ে বিপত্তি ঘটে। সমঝোতার ৭দলই একমত ছিল বড় দল হিসেবে জামায়াতকে এককভাবে অর্ধেক তথা ১৪০/১৫০ আসন দেবে। বাকি অর্ধেক ৭দল নেবে এবং যে যেখানে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা, সেই দল সেখানে প্রার্থী দেবে! কিন্তু জামায়াত আরও বড় দল সাজতে চাইলো, মোড়লীপনা দেখালো। এতে কোনো দলই সায় দিলো না! গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমীরে জামায়াত পূর্বনির্ধারিত সফর দেখিয়ে লন্ডন চলে গেলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিন্ন গুঞ্জন চাউর হয়, সেই বয়ানও আমরাই ভাঙি, বলি তিনি জরুরি সফরেই গেছেন, ভিন্ন উদ্দেশ্য নাই। এসব বলেছি স্রেফ সমঝোতা ধরে রাখতেই।
০৩। আসন সমঝোতা না করে অন্যান্য দলের সঙ্গে কোনো ধরণের আলোচনা ছাড়াই এনসিপিকে যুক্ত করে জামায়াত এবং মিডিয়ায় প্রচার পায় “৩০ আসন নিয়ে জামায়াত জোটে এনসিপি!”
সমঝোতায় কালো থাবার শঙ্কা প্রবল হতে শুরু করে। পীর সাহেব চরমেনাই এতকিছুর পরও সমঝোতার স্বার্থে সবকিছু ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। তৃণমূলে বিরুপ প্রভাব যেন না পড়ে তাই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব গাজী আতাউর রহমান মিডিয়াকে বলেন— আমাদের সঙ্গে আলাপ করেই এনসিপিকে নেওয়া হয়েছে!
জামায়াতের কর্মকান্ড সমঝোতা ভাঙার, ধরে রাখার চেষ্টা করেন পীর সাহেব চরমোনাই। এনসিপির সঙ্গে বৈঠকের সময়টা ছিল পূর্বনির্ধারিত আসন সমঝোতার বৈঠক। সময়টাও নির্ধারণ করেছিল জামায়াতই। সেখানে মিথ্যার আশ্রয়টাও নেয় জামায়াত!
০৪। পরবর্তিতে আরও দুইটি দল যোগ করে জামায়াত এবং এবি পার্টির চেয়ারম্যান মঞ্জু ভাইর কথায় স্পষ্ট— এবিকে একপ্রকার তোষামোদ করেই জামায়াত সঙ্গে টেনেছে! তাদেরকে নিতে অসুবিধা নাই, আলোচনা ছাড়া নিয়েছে এবং আসন দিয়েছে! যা তাদের একক অধিকারেই নাই। এসব দল নিয়ে জামায়াত আমীর ব্রিফিং দেন “এটা ইসলামী সমঝোতা নয়, রাজনৈতিক সমঝোতা!”
০৫। সিদ্ধাস্ত ছিল ২৫ ডিসেম্বরের আগে আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হবে এবং ২৫ তারিখের পর সেই আলোকে মনোনয়ন ফর্ম জমা দেবে। কিন্তু কোনো আলোচনা ছাড়াই ২৫ তারিখ জামায়াতের প্রার্থীরা সারাদেশে মনোনয়ন সাবমিট করে! ইসলামী আন্দোলন তখনও অপেক্ষা করেছে সমঝোতা ধরে রাখার। কিন্তু জামায়াত ২০০ আসনের নিচে নামবে না বলেই সময়ক্ষেপন শুরু হয়। উপায় না দেখে মনোনয়ন জমার শেষদিন অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮ আসনে ফর্ম জমা দেন। জামায়াত এভাবে সবাইকে ধোকায় না রাখলে ৩০০ আসনেই অন্যান্য দল ফর্ম জমা দিতে পারতো।
০৬। সমঝোতায় যখন কালো আঁধার ধেয়ে আসতে শুরু করে, তখন পীর সাহেব চরমোনাই শায়খে চরমেনাইকে ঢাকা নিয়ে আসেন। কিন্তু জামায়াতের আমীর সাহেব চলে যান ওমরায়! এ কেমন লুকোচুরি? যাহোক, সমঝোতা বৈঠকে আব্দুল্লাহ তাহের সাহেব সাফ সাফ জানিয়ে দেন “আপনারা ৪০ আসন পাবেন!” কী অবাক করা বিষয়! তাহের সাহেব আসন দেওয়ার কে? তাদের কাছে চাইতেই বা গেছে কে? বরং ওয়ান বক্স পলিসিতে জামায়াত ছিল অনুপ্রবেশকারী।
০৭। কারও সঙ্গে আলোচনা না করে এবং কোনো ধরণের মীমাংসা ছাড়াই জামায়াতের একের পর এক তথ্যসন্ত্রাস ঘটানো। মিথ্যা নিউজ, জরিপ ও মিডিয়ায় বলে বেড়ানো “অমুক দলকে এত দিয়েছি, আমরা এত রেখেছি!” তাদের কাছে কেউ আসন চায়নি বরং তারা ২০০ দাবি করেছে অথচ নিউজ ছড়িয়েছে অন্যদের বিরুদ্ধে!
০৮। ইসলামী আন্দোলনকে ছোট করে উপস্থাপনা করা এবং নিজেদের অতিতের সরকারী দলের মতো আচরণ দেখানো। ইসলামী আন্দোলনের অগ্রগামী আসনগুলো নিজেদের দাবি করা, ভোটের পার্সেন্ট সামনে এনে গুরুত্বহীন বুঝানো, জামায়াত ছাড়া হাতপাখা জিততে পারবে না বলে অহঙ্কার প্রদর্শন। যদিও জামায়াত আমীরের অতীত রেকর্ড জামানত বাজেয়াপ্তের।
০৯। কোনো ধরণের সমঝোতা স্বাক্ষর ছাড়াই দেশব্যাপী জামায়াত প্রার্থীদের ১১দল সমর্থিত প্রার্থী বলে ঢালাওভাবে প্রচার করা।
১০। তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে বিএনপির সাথে ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে কথা বলা, বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠনের প্রকাশ্য বক্তব্য প্রদান সমঝোতার সাথে স্পষ্ট বিশ্বাস ঘাতকতা।
১১। সমঝোতাটা ছিল রাস্ট্রক্ষমতায় ইসলাম বসানো, কিন্তু জামায়াতকে পেয়ে বসে ক্ষমতালোভে! তারা ইসলামী দলসমূহের কাঁধে ভর দিয়ে এককভাবে ক্ষমতায় যাবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। আব্দুল্লাহ তাহের সাহেব এ কথা নিজ মুখে উচ্চারণও করেছেন যে, আমরা এককভাবে ১৫০+ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করব! সবাইকে নিয়ে জামায়াত ক্ষমতায় যেতে রাজি না বলেই ইনলামী দলগুলো তাদেরকে ১৪০/১৫০ আসন দেওয়ার পরও ২০০ আসনের গো ধরে নানারকম কুটচালে সময় পার করে তানা।
১২। শায়খে চরমোনাইকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় সোশ্যাল আক্রমণ! ছবি বিকৃতি। তাঁকে নিয়ে ভিডিও পর্যন্ত বানিয়েছে যা তা ভাষায়! ফেসবুকে গালাগালি এবং অশ্রাব্য ভাষা বর্বর জাতিকেও হার মানাবে। কোনো ইসলামী দলের কর্মীরা এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে না। ইসলামী আন্দোলনের কোনো কর্মী জামায়াতের কোনো নেতাকে কটাক্ষ করেছে দেখাতে পারবেন না। তারা জামায়াতের সমঝোতা ভাঙার অপকৌশলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু জামায়াত কর্মীরা করছে গালাগালি, এখনও করে যাচ্ছে। সমঝোতা ভাঙবেও তারা, অন্যদিকে আইএবির ওপর দোষ চাপিয়ে গালাগালিও করবে তারাই! হয়ত এটা তাদের পরিকল্পনারই অংশ।
১৩। পীর সাহেব চরমেনাই সকল প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে এবং শায়খে চরমোনাই দুইটি আসনের নির্বাচনী কাজকর্ম ফেলে বহুদিন যাবত ঢাকায় পড়ে আছেন, কিন্তু জামায়াত তাঁদেরকে দিনের পর দিন ঘুরিয়েছে। পীর সাহেব চরমোনাই সমঝোতা ধরে রাখার শেষ চেষ্টাটুকু পর্যন্ত করেছেন, কিন্তু জামায়াত ইসলামী আন্দোলন-সহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলোর রাজনীতিটাই খেয়ে দেওয়ার অপকৌশলে মেতেছে। জামায়াত কখনও ইসলামপন্থার ঐক্য চায়নি বরং বারবার ভেঙেছে এবং গোলাম আজম সাহেবের এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য/লিখনিও আছে “কওমীদের ঐক্য হতে দেবে না!” ইসলাম বলতে তারাই থাকবে এবং বাকি সব তাদের আনুগত্যে ব্যবহার হবে।
১৪। জামায়াতের এমন হঠকারিতার কারণে সারাদেশে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ও কর্মীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সাংগঠনিক ও নির্বাচনী কাজ ব্যহত হয়। তৃণমূলে সমঝোতার যে ফলোটা তৈরি হয়েছিল সেটাতে ভাটা পড়ে। জামায়াতের চরিত্র নিয়ে চা-স্টলে নতুন আলাপ ওঠে। সাধারণ জনতা-সহ কেন্দ্রের প্রতি তৃণমূলের চাপ আসতে থাকে ধোঁকাবাজ জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার কোনো মানে নাই। তারা ইসলামী দলসমূহের সমঝোতা নস্যাৎ করতেই অনুপ্রবেশ করেছিল। অতীতে কখনও ইসলামী ঐক্য করেনি জামায়াত বরং ক্ষমতার অংশ হতে কখনও লীগ কখনও বিএনপির সাথে ঐক্য করেছে আর তাদের এসব অন্যায় ঢাকতে অন্যান্য ইসলামী দলকে দালাল ও ঐক্যবিরোধী বলে প্রচার করেছে। এটাই তাদের চরিত্র। ফলে তাদেরকে ৩০০ আসনই ছেড়ে দিয়ে শুরুর মতো বাকি ইসলামী দলগুলো সমঝোতায় নির্বাচন করার মতামত প্রদান করে তৃণমূল।
১৫। আসন বা ক্ষমতা দরকার এজন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ “ওয়ান বক্স পলিসি” নিয়ে আসেনি, সমঝোতার ফর্মুলাও পেশ করেনি। ব্যাপারটা যদি সেরকমই হতো তবে তো বিএনপির সঙ্গেই যেতে পারতো! মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব নিজে আইএবির কেন্দ্রীয় অফিসে গিয়েছেন। ১০টি বিষয়ে ঐক্যমতও হয়েছিলেন। ক্ষমতার অংশ হওয়ার কী দারুণ সুযোগ ছিল ইসলামী আন্দোলনের! কিন্তু পীর সাহেব চরমোনাইর দৃঢ়চিত্ত— কোনো দলকে নয়, ইসলামী শক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে হবে। এই নীতি জামায়াতের কারণে ভ্রষ্ট হচ্ছে বলেও সমঝোতা ভেঙে যেতে পারে।
ক্ষমতায় বসতে যাওয়া ইসলামী শক্তি এখন দুর্বল বিরোধী দলও হতে পারছে না সম্ভবত। আর এর একমাত্র কারণ জামায়াতের অতি ক্ষমতালোভ।
জামায়াত এখনও যদি ইসলামী দলগুলোর দেওয়া ১৪০/১৫০ আসন মেনে নেয় তবে সমঝোতা টিকে যাবে, নয়তো নয়।
সমঝোতার ওপর এখনও আশাবাদী থেকে শেষ দু’টি কথা বলি— প্রথমত এই সমঝোতার জন্য আমার মতো মাঠে-ময়দানের মানুষরাই বেশি আকাঙ্খিত ছিলাম কারণ আমরা তৃণমূলের ভাষা বুঝি। ফলে সমঝোতার আলাপ ওঠার পর থেকে প্রচার-প্রচারণা ও আনন্দ প্রকাশেও কমতি ছিল না। কমিটির বারণ সত্বেও বয়ানে বয়ানে এই সমঝোতার ফেরি করেছি। আবার হতাশও হচ্ছি আমরাই।
দ্বিতীয়ত আমি কে যে আমার কথায় সমঝোতা ভাঙবে? যদি আমার লেখায় প্রভাবই থাকে তবে তাতে সমঝোতার দ্বারই খুলবে, ভাঙবে না। হয়েছেও তাই। আমি না লিখলে ইসলামী আন্দোলনের ওপর দায় চাপিয়ে হয়ত এতদিনে জামায়াতই সমঝোতা ভেঙে দিতো। সবকিছু একপাশে রাখলেও আমি কি ইনসাফের কথা বলব না?
লেখক হাবিবুর রহমান মিসবাহ



